
রংপুর, প্রতিনিধি: রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। তবে মামলার এজাহারে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে আটক দুই যুবক মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসের (১৯) নাম উল্লেখ করা হয়নি। মামলাটি করা হয়েছে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে।
রোববার (২৪ আগস্ট) নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলাটি করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে মাছুয়াপাড়া গ্রামের মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পুলিশ দাবি করেছে, তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এরপর তাদের ওই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এজাহারে নেই আসামিদের নাম
মামলার এজাহারে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এমনকি মামলায় আসামির সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়নি।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ যাদের আটক করে পরে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে, তাদের নাম কেন এজাহারে নেই। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
যেভাবে প্রকাশ্যে আসে হত্যাকাণ্ড
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকে তাঁর শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। এরপর গণপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন।
পরদিন শুক্রবার রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে প্রীতিলতা তাঁর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীকে ফোন করেন। তবে তখন তাদের মধ্যে কথা হয়নি। এরপর থেকে প্রীতিলতার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে পূজা আবার বড় বোন প্রীতিলতাকে ফোন করেন। কিন্তু পরিবারের চার সদস্যের মুঠোফোনই বন্ধ পান তিনি। এতে সন্দেহ তৈরি হলে তিনি বিষয়টি তাঁর স্বামী বিপুল আচার্যকে জানান।
পরে শনিবার রাত সোয়া ৯টার দিকে তাঁরা প্রীতিলতার বাড়িতে যান। বাড়িটি তখন অন্ধকার ছিল। ভেতর থেকেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না।
জানালা ভেঙে মিলল মরদেহের সন্ধান
পূজা চক্রবর্তী ও তাঁর স্বামী প্রতিবেশী দেবুর বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি জানান। পরে পূজা প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে তাঁর ভগ্নিপতি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান।
সেখান থেকে জানালার লক ভেঙে টর্চের আলো দিয়ে ঘরের ভেতরে তাকান তিনি। এ সময় ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান। একই সঙ্গে বাড়ির ভেতর থেকে পচা গন্ধও বের হচ্ছিল।
পরে বিষয়টি স্বজন ও স্থানীয়দের জানানো হয়। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে।
হত্যার পর ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা?
এজাহারে বলা হয়েছে, ২১ আগস্ট রাত আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিট থেকে ২২ আগস্ট সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কোনো এক সময় অজ্ঞাতনামা আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেন।
বাড়ির বিভিন্ন কক্ষের আলমারি, শোকেসসহ আসবাবপত্র এবং কাপড়চোপড় এলোমেলো ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘরের এমন পরিস্থিতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার পর ঘটনাটিকে অন্য কোনো ঘটনার মতো দেখানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।
‘সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করবে পুলিশ’
মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, তিনি খবর পেয়ে গ্রাম থেকে রংপুরে এসেছেন এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করেছেন। তাঁর আশা, পুলিশ সঠিকভাবে তদন্ত করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা বের করবে।
পুলিশের দাবি, দুইজন গ্রেপ্তার
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজন হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে মাছুয়াপাড়া গ্রামের মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আটক করা হয়েছিল।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। পরে তাদের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীসহ নিহত পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্তদের চিনতেন। পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং হত্যার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।















