
স্টাফ রিপোর্টারঃ গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত দ্রুত ও আধুনিক গণপরিবহন সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পটি এখন সরকারের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও প্রকল্পটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ভুল পরিকল্পনা, ত্রুটিপূর্ণ নকশা এবং দুর্নীতির অভিযোগে এটি এখন দেশের অন্যতম বিতর্কিত মেগা প্রকল্প।
২০১৩ সালে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল মাত্র ৩৫ মিনিটে গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্টে যাতায়াত নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবে যানজট কমার বদলে অনেক স্থানে বেড়েছে, জনদুর্ভোগও পৌঁছেছে চরমে।
‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় নেওয়া এই প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২,০৪০ কোটি টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ৪,২৬৮ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ব্যয় বাড়িয়ে ৬,৫৯৭ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা বাতিল করে দেয় সরকার।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় একাধিক বিদেশি ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান। নির্মাণকাজে যুক্ত ছিল চীনের তিনটি কোম্পানি এবং একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান। তবে দীর্ঘসূত্রতা, সমন্বয়হীনতা ও অভিযোগিত অনিয়মে প্রকল্পটি বারবার পিছিয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটির নকশা বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দেশের যানবাহন যেখানে বাম পাশে চলাচল করে, সেখানে বিআরটির নকশা করা হয়েছে ডান পাশভিত্তিক চলাচল ধরে। ফলে চালক প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে পুরো ব্যবস্থাপনায় নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া ফুটপাতের ওপর এস্কেলেটর বসানো, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পারাপারের ঘাটতি—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি জনবান্ধব হওয়ার বদলে জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে উত্তরায় গার্ডার ধসে অন্তত পাঁচজন নিহত হন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় দুর্ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন, যা প্রকল্পটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্পটিতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। বাস কেনার টেন্ডারে অনিয়ম, নির্মাণকাজে নকশা পরিবর্তন করে অর্থ আত্মসাৎ এবং ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি—এসব অভিযোগ এখন তদন্তাধীন।
একটি টেন্ডারে কম দামে বাস কেনার সুযোগ থাকলেও তা বাতিল করে বেশি দামে নতুন টেন্ডার দেওয়া হয়—এমন অভিযোগও উঠেছে। এতে প্রতিটি বাসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ স্থগিত করে সড়কটি সাধারণ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি একটি সাধারণ সড়ক হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পুরো রুটে এখনও যানজট, খোঁড়াখুঁড়ি এবং অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। যাত্রীরা আগের চেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান সরকার জানিয়েছে, প্রকল্পটির অনিয়ম ও ত্রুটি খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকল্পটি আংশিকভাবে হলেও কার্যকর করা সম্ভব। নতুবা বিপুল অর্থ ব্যয়ের এই প্রকল্প পুরোপুরি ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে থাকবে।















