এখন ০২:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দলীয় স্বার্থে ব্যবহার, পরে দায়িত্ব এড়াতে অস্বীকার—ডেভিডের মৃত্যুকে ঘিরে দুই দশকের বিতর্ক

ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ২১ বছর: ডেভিডকে ব্যবহার করে শেষমেশ ছুঁড়ে ফেলেছিল বিএনপি

  • নাজমুল হক
  • প্রকাশিত হয়েছে: ১১:৪০:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫
  • ৬৫১ পড়া হয়েছে

দলীয় স্বার্থে ব্যবহার, পরে পুরো দায় অস্বীকার—এভাবেই রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে ডেভিড নামটি। ধুলোমাখা হয়ে যাওয়া দুই দশকের সেই আলোচনা আবারও সামনে চলে আসে তার ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ২১ বছর পূর্ণ হওয়ায়।

ব্যবহার, তারপর অস্বীকার

২০০০–এর দশকের গোড়ায় ডেভিড ছিলেন বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের অত্যন্ত সক্রিয় এক কর্মী। বিভিন্ন কর্মসূচি, রাজনৈতিক প্রদর্শন ও সংঘর্ষে তাকে সামনে পাওয়া যেতই। স্থানীয় নেতৃত্বের নির্দেশে তিনি প্রায়শই এমন ভূমিকা নিতে বাধ্য হতেন, যা রাজনৈতিক সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠত।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, দলীয় স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তীতে এসব ঘটনার দায় কখনোই দল গ্রহণ করেনি। বরং ডেভিডসহ অনেক ফিল্ড-লেভেল কর্মীকে “নিজ দায়িত্বে করা কাজ” বলে চালিয়ে দেওয়া হতো।

ক্রসফায়ারের সেই রাত

এক রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে “বন্দুকযুদ্ধের” কথা জানিয়ে ডেভিডকে ক্রসফায়ারে নিহত দেখানো হয়। সরকারিভাবে ঘটনাটিকে আইনগত অভিযান বলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন মত ছিল। অনেকেই দাবি করেন—ডেভিডের উপর রাজনৈতিক চাপ, অপব্যবহার এবং পরবর্তীতে পরিত্যাগই তাকে এই পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।

তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্ব ঘটনাটিকে “ব্যক্তিগত অপরাধ” এবং “দলীয় সম্পর্কহীন” বলে মন্তব্য করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—ডেভিডের কর্মকাণ্ড দলের অনুমোদন, নির্দেশনা কিংবা প্রত্যক্ষ ইশারায়ই পরিচালিত হতো।

নিহতের পরিবারের ক্ষোভ আজও অগ্নিগর্ভ

ডেভিডের পরিবার এখনও বিশ্বাস করে—দলীয় প্রয়োজনে তাকে সামনে রাখা হয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুর পর তাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়।

পরিবারের এক সদস্য বলেন—
“যেদিন কাজে লাগছিল, সেদিন দলের লোকজন আমাদের বাড়িতে লাইন দিত। কিন্তু যেদিন লাশ এলো, সেদিন কেউ ছিল না।”

এই বেদনাই আজ ২১ বছর পরও কমেনি।

দুই দশক পরও কেন ফিরে আসে এই ঘটনা?

ডেভিডের মৃত্যু বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ব্যবহার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড এবং দলীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

বিশ্লেষকদের মতে—
রাজনৈতিক স্বার্থে মাঠের কর্মীদের ব্যবহার,
ঝুঁকিপূর্ণ কাজে উৎসাহ,
পরিণতি এলে অস্বীকার,
এ তিনটি উপাদানই ডেভিডের ট্র্যাজেডিকে একটি ‘মডেল কেস’ বানিয়েছে।

বিএনপির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে

বিএনপি নেতারা এখনও দাবি করেন—ডেভিড দলের কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে ছিলেন না। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের ইতিহাস, দলীয় কর্মকাণ্ডের ছবি, এবং ঘটনার আগের রাজনৈতিক উত্তাপ—সবকিছু মিলিয়ে ভিন্ন প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।

২১ বছর পরও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন—
বিএনপি কি ডেভিডকে ব্যবহার করে পরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।

ঘটনার প্রভাব: রাজনীতিতে আরও সতর্কতার দাবি

ডেভিডের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিল্ড-লেভেল নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও দলীয় দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

অনেকেই মনে করেন—
“রাজনীতি শুধু নেতৃত্বের জন্য নয়, কর্মীদের জীবনও রক্ষা করার দায়িত্ব।”

২১ বছর আগে হারানো এক তরুণের মৃত্যু তাই আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার রাজনীতি কখনোই টেকসই নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

পঞ্চগড়ে উপজেলা পরিষদে এমপির পরিদর্শন কক্ষের উদ্বোধন

দলীয় স্বার্থে ব্যবহার, পরে দায়িত্ব এড়াতে অস্বীকার—ডেভিডের মৃত্যুকে ঘিরে দুই দশকের বিতর্ক

ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ২১ বছর: ডেভিডকে ব্যবহার করে শেষমেশ ছুঁড়ে ফেলেছিল বিএনপি

প্রকাশিত হয়েছে: ১১:৪০:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

দলীয় স্বার্থে ব্যবহার, পরে পুরো দায় অস্বীকার—এভাবেই রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে ডেভিড নামটি। ধুলোমাখা হয়ে যাওয়া দুই দশকের সেই আলোচনা আবারও সামনে চলে আসে তার ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ২১ বছর পূর্ণ হওয়ায়।

ব্যবহার, তারপর অস্বীকার

২০০০–এর দশকের গোড়ায় ডেভিড ছিলেন বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের অত্যন্ত সক্রিয় এক কর্মী। বিভিন্ন কর্মসূচি, রাজনৈতিক প্রদর্শন ও সংঘর্ষে তাকে সামনে পাওয়া যেতই। স্থানীয় নেতৃত্বের নির্দেশে তিনি প্রায়শই এমন ভূমিকা নিতে বাধ্য হতেন, যা রাজনৈতিক সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠত।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, দলীয় স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তীতে এসব ঘটনার দায় কখনোই দল গ্রহণ করেনি। বরং ডেভিডসহ অনেক ফিল্ড-লেভেল কর্মীকে “নিজ দায়িত্বে করা কাজ” বলে চালিয়ে দেওয়া হতো।

ক্রসফায়ারের সেই রাত

এক রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে “বন্দুকযুদ্ধের” কথা জানিয়ে ডেভিডকে ক্রসফায়ারে নিহত দেখানো হয়। সরকারিভাবে ঘটনাটিকে আইনগত অভিযান বলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন মত ছিল। অনেকেই দাবি করেন—ডেভিডের উপর রাজনৈতিক চাপ, অপব্যবহার এবং পরবর্তীতে পরিত্যাগই তাকে এই পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।

তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্ব ঘটনাটিকে “ব্যক্তিগত অপরাধ” এবং “দলীয় সম্পর্কহীন” বলে মন্তব্য করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—ডেভিডের কর্মকাণ্ড দলের অনুমোদন, নির্দেশনা কিংবা প্রত্যক্ষ ইশারায়ই পরিচালিত হতো।

নিহতের পরিবারের ক্ষোভ আজও অগ্নিগর্ভ

ডেভিডের পরিবার এখনও বিশ্বাস করে—দলীয় প্রয়োজনে তাকে সামনে রাখা হয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুর পর তাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়।

পরিবারের এক সদস্য বলেন—
“যেদিন কাজে লাগছিল, সেদিন দলের লোকজন আমাদের বাড়িতে লাইন দিত। কিন্তু যেদিন লাশ এলো, সেদিন কেউ ছিল না।”

এই বেদনাই আজ ২১ বছর পরও কমেনি।

দুই দশক পরও কেন ফিরে আসে এই ঘটনা?

ডেভিডের মৃত্যু বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ব্যবহার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড এবং দলীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

বিশ্লেষকদের মতে—
রাজনৈতিক স্বার্থে মাঠের কর্মীদের ব্যবহার,
ঝুঁকিপূর্ণ কাজে উৎসাহ,
পরিণতি এলে অস্বীকার,
এ তিনটি উপাদানই ডেভিডের ট্র্যাজেডিকে একটি ‘মডেল কেস’ বানিয়েছে।

বিএনপির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে

বিএনপি নেতারা এখনও দাবি করেন—ডেভিড দলের কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে ছিলেন না। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের ইতিহাস, দলীয় কর্মকাণ্ডের ছবি, এবং ঘটনার আগের রাজনৈতিক উত্তাপ—সবকিছু মিলিয়ে ভিন্ন প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।

২১ বছর পরও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন—
বিএনপি কি ডেভিডকে ব্যবহার করে পরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।

ঘটনার প্রভাব: রাজনীতিতে আরও সতর্কতার দাবি

ডেভিডের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিল্ড-লেভেল নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও দলীয় দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

অনেকেই মনে করেন—
“রাজনীতি শুধু নেতৃত্বের জন্য নয়, কর্মীদের জীবনও রক্ষা করার দায়িত্ব।”

২১ বছর আগে হারানো এক তরুণের মৃত্যু তাই আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার রাজনীতি কখনোই টেকসই নয়।