আলিফ হোসেন, তানোর -ঃ রাজশাহীর তানোরের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল বোঝে না।জানা গেছে, প্রায় একযুগ আগে সনাতনী পদ্ধতির পরিবর্তে সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হলেও অদ্যাবধি তা আয়ত্ত করতে পেরেছেন মাত্র ৫ শতাংশ শিক্ষক মন্তব্য সংশ্লিস্টদের। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বাস্তবে এই চিত্র আরও করুণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, তানোরে সৃজনশীল বোঝে এবং প্রশ্ন করতে পারে এমন শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ৫ শতাংশের মতো।
সুত্র জানায়, সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকরা পরীক্ষার প্রশ্ন নিজেরা প্রণয়ন করতে পারেন না, যা চাকরিবিধিমালা পরিপন্থী। কোথাও শিক্ষক সমিতি আবার কোথাও বিভিন্ন পেশাদার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রশ্ন কিনে আনে স্কুলগুলো। আবার অনেকে গাইড বই দেখে প্রশ্ন তৈরি করেন। অথচ গাইড ও নোটবইয়ের দাপট কমাতে এই পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নের এই করুণ পরিস্থিতির
বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন তৈরি করতে যে পরিমাণ দক্ষতা দরকার তা সিংহভাগ শিক্ষকেরই নাই, হয়তো টেনেটুনে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্ন শিক্ষকরা করেন। কিন্তু ষান্মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন অনেকেই গাইড বই দেখে তৈরি করেন। অনেকে আবার নানাভাবে প্রশ্ন সংগ্রহ করেন যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেসিপ প্রকল্পের মাধ্যমে একমুখী শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে সৃজনশীল পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এরই অংশ হিসেবে ২০০৪ সালে প্রথম এ পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তখন এর নাম ছিল কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতি। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নেতৃত্বে গড়ে উঠা আন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালে সরকার আর একমুখী শিক্ষা চালু করতে পারেনি। পরে অবশ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের উদ্যোগে দেশের শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে এ পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ২০০৭ সালের জুনে এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের সরকারি আদেশ জারি হয়। ২০০৮ সাল থেকে পদ্ধতিটি নবম শ্রেণীতে চালু হয়। ২০১০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম প্রবর্তন ঘটে। সেই হিসাবে জুনে এ পদ্ধতি প্রবর্তনের একযুগ হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি এতদিনেও এই পদ্ধতি শিক্ষকরা পুরোপুরি আয়ত্বই করতে পারেননি। সুত্র জানায়, মাউশির আওতাধীন নয়টি অঞ্চলের ৬ হাজার ৯৯৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সমীক্ষা
পরিচালনা করা হয় যেখানে উঠে আসে হতাশাজনক চিত্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশকিছু কারণে সৃজনশীল পদ্ধতি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এর মধ্যে এক নম্বরে আছে শিক্ষকদের সদিচ্ছার অভাব। এছাড়া আছে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পাওয়া, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্বল মনিটরিং, শিক্ষকদের কোচিং মানসিকতা এবং বিভিন্ন শিক্ষক সমিতির ব্যবসা। অথচ প্রত্যেক স্কুলে প্রত্যেক বিষয়ে অন্তত একজন শিক্ষক সৃজনশীলে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তাদের পিছনে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেছে সরকার। কথা ছিল, তারা গিয়ে বাকিদের প্রশিক্ষণ দেবেন। কিন্ত্ত তারা নিজেরাই প্রশিক্ষণ নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। এমন অনেক শিক্ষক আছে যারা ঠিকমতো সৃজনশীল এমনকি প্রশিক্ষণের ভাষাও বোঝেন না। এদিকে অভিভাবক মহলের অভিমত, সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রজেক্টর, ল্যাপটপ-ডেক্সটপ সরবরাহ ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ করেছে, তবে এসব যদি কোনো কাজে না আশে তাহলে এসব শিক্ষকদের এমপিও বন্ধ করা জরুরী। তা না হলে এরা শোধ রাবে না, সরকারের শুধু টাকার অপচয় হবে।

















