পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধিঃ সংস্কার ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়, আর বিচার ছাড়া অপরাধীদের অধিকার স্বীকৃতি দেওয়াও উচিত নয়’- এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।

তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতারিত হয়েছে এবং সামনের দিনে তাদের ধ্বংস অপেক্ষা করছে। কেউ যদি তওবা করে ভালো মানুষ হয়, হতে পারে; কিন্তু যারা অপরাধ করেছে তাদের অবশ্যই বিচার হতে হবে। বিচার হওয়ার আগে তাদের কোন অধিকার স্বীকার করা উচিত নয়। আর তারা যেসব অন্যায় কাজ করেছে, সেগুলোকে রেখে নির্বাচন করলে এই নির্বাচন সঠিক নির্বাচন হবেনা। এজন্য সংস্কার করতে হবে। তাই আমাদের কথা হলো- সংস্কারের আগে কোন নির্বাচন নয়, আর বিচার করা ছাড়া কারো অধিকার স্বীকৃতি দেয়া উচিত হবেনা।
শনিবার রাতে পঞ্চগড় সরকারি অডিটোরিয়ামে পঞ্চগড় জেলা জামায়াত আয়োজিত ওয়ার্ড ও ইউনিট সভাপতি সম্মেলনে প্রধান অথিতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, বিচার যদি বলে নিরপরাধরা সব অধিকারই ফিরে পেতে পারে, কিন্তু যারা অপরাধী তাদের অধিকার স্বীকার করা মানবতাবাদী কথা হতে পারেনা। আমরা সেটাই দাবি করছি- নির্বাচনটা সেভাবেই হবে। উপদেষ্টা সরকারকে আমরা বলেছি, আপনারা সংস্কার করেন, এরপর নির্বাচন দেন। আর বিচার করেন, এরপর সিদ্ধান্ত নেন কারা যোগ্য নির্বাচন করার; আর কারা যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন।
জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসকে ধ্বংস করা হয়েছে কেয়ারটেকার সরকার নিষিদ্ধের মাধ্যমে। বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী কেয়ারটেকার সরকার এনেছে এবং সাবেক আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আজম ছিলেন এই কেয়ারটেকার সরকারের রূপকার। সেসময় কেয়ারটেকার সরকার দিয়েই নির্বাচন করার বিষয়টি সবাই মেনে নেয়; এমনকি ফ্যাসিস্ট সরকারও মেনে নিয়েছিলো। মেনে নেয়ার পর আবার নিরপেক্ষ নির্বাচনকে হত্যা করা হলো সংবিধান থেকে কেয়ারটেকার সরকারকে বিদায় করার মাধ্যমে।
একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা প্রসঙ্গে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ একাত্তর সালে স্বাধীন হলো। সেসময় টার্গেট ছিলো- আমাদের (বাংলাদেশের) উপর যেন জুলুম না করা হয়, বৈষম্য না হয়। এরপর ভোটের এবং ভাতের অধিকার যোগ হলো। এই কয়েকটা ইস্যু নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হলো, সেই আন্দোলনে জয়লাভও হলো। আমি তখন স্কুলছাত্র। আমরা দেখলাম পাকিস্তান থেকে মিলিটারিরা এসে মানুষ মারছে, আবার পূর্ব পাকিস্তানে যারা উর্দুভাষি ছিলো তাদেরকেও মারা হয়েছে। অর্থ্যাৎ, একপক্ষ নয়; উভয়পক্ষই মারামারি হয়েছে। এটা সীমালঙ্ঘন ছিলো। ইসলামে মারতেও নিষেধ করা হয়েছে, সীমালঙ্ঘন করতেও নিষেধ করা হয়েছে। ওই সময় ভারত আমাদের সহযোগিতা করলো। তখন একদল লোক মনে করলো ভারত কেন আমাদেরকে সহযোগিতা করছে? তারা মনে করলো সহযোগিতা করছে এ উদ্দেশ্যে যে, প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান জোড়া লেগে থাকলে শক্তিটা বেশি হবে। আলাদা হলে দুর্বল হয়ে যাবে। এজন্য এটাকে ভাঙতে হবে। তবে অধিকাংশ লোক অধিকার আদায়ের জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করলো।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, তখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ছিলোনা, জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ছিলো। সেখানে তিনটা কারণে এই দলটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বলে আমি শুনেছি। প্রথমত আমরা মুসলমান হিসেবে বন্ধু গ্রহণ করবো, তবে কোন কাফেরকে (ভারত) নয়। দ্বিতীয়ত দেশটা যদি আলাদা হয়ে যায়, তাহলে দুর্বল হয়ে যাবে, এই সুযোগে প্রতিবেশি দেশ শোষণ করবে। স্বাধীনতা পরবর্তী তাই হয়েছে। আমাদের অস্ত্র-শস্ত্র, পাটকল- সব নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
তিনি বলেন, তারা বলেছিলো, ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু আমরা দেখলাম, ৭৪ সালে মানুষ কি পরিমাণ ক্ষুধার্ত ছিলো। মানুষ খেতে না পেরে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছিলো। এরপর আসলো ভোটের অধিকার! তারা বলেছিলো, আমার ভোট আমি দিবো, যাকে ইচ্ছা তাকে দিবো; কিন্তু হয়ে গেলো- আমার ভোট আমি দিবো, তোমার ভোটও আমি দিবো। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে তামাশার নির্বাচন দিয়ে বিনাভোটের সরকার গঠণ করলো। ২০১৮ সালে রাতের ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার পর ২০২৪ সালে দেখা গেলো- মানুষ শুধু ভোট থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়নি, বরং প্রার্থী হতেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলো। ফলে জাতিকে তারা ডামি নির্বাচন উপহার দিলো।
জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা ইকবাল হোসাইনের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি মাওলানা দেলওয়ার হোসেনের সঞ্চালনায় এই সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম।
এ ছাড়াও অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- পঞ্চগড় জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি জুলফিকার রহমান, জেলা জামায়াতের মানবসম্পদ বিভাগীয় সভাপতি শাহীদ আল ইসলাম, জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আবুল বাশার বসুনিয়া, পঞ্চগড়-২ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী সফিউল্লাহ সুফি, পঞ্চগড় শহর আমীর জয়নাল আবেদীন, সদর উপজেলা আমীর সফিউল আলম, দেবীগঞ্জ উপজেলা আমীর আব্দুল বাসেত, বোদা উপজেলা আমীর জাহিদুর রহমান, আটোয়ারী উপজেলা আমীর ইউনূস আলী খাঁন প্রমূখ।
















