এখন ০২:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
নিঃসঙ্গতার আড়ালে লুকানো অদম্য শক্তি, ত্যাগ আর আজীবনের ভ্রাতৃত্বের গল্প

“ক্যাডেট লাইফ: নিঃসঙ্গতার ভেতর জন্ম নেওয়া ভ্রাতৃত্বের অদেখা মহাকাব্য”

  • মাইনুদ্দিন মঈন
  • প্রকাশিত হয়েছে: ১২:০১:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
  • ৭০৩ পড়া হয়েছে

স্টাফ রিপোর্টারঃ ক্যাডেট কলেজ মানে শুধু ডিসিপ্লিন নয়, এটা আসলে এক মস্ত বড় “নিঃসঙ্গতার উৎসব”, যেখানে আমরা যারা ক্যাডেট এ পড়ি (ক্যাডেটরা ) সবাই একা হয়েও কখনো একা নই। সবাই যখন বলে, “তোদের (ক্যাডেট দের) তো লাইফ সেট,” তখন মনের ভেতরটা এক অদ্ভুত বিষাদে ছেয়ে যায়। কেউ দেখে না সেই বারো-তেরো বছর বয়সের ছোট ছেলেটাকে, যে প্রথমবার মায়ের আঁচল ছেড়ে ক্যাডেট কলেজের লোহার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল। কেউ দেখে না সেই পিচ্চি বাচ্চাটার কান্নায় ভেজা বালিশ, যে মাঝরাতে বাথরুমে গিয়ে ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে ডুকরে কেঁদেছিল যাতে পাশের বেডের বন্ধুটা টেরও না পায় সে তার মাকে মিস করছে। সেই চোখের জল মুছে পরদিন সকালে আবার খটখটে অক্সফোর্ড জুতা পরে প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘সাবধান হতে শেখার নামই ‘ক্যাডেট লাইফ।

# তোমরা যখন এসি রুমে বসে ইউটিউবে ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ শোনো, ক্যাডেটরা ক্যাডেটরা তখন পিটি গ্রাউন্ডে ভোরের কুয়াশার মাঝে নিজের ফুসফুসটাকে শেষ সীমানা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাই। ক্যাডেটদের মোটিভেশন কোনো ভিডিওতে থাকে না, থাকে পাশের ক্লাসমেটের হাপানি ভরা নিঃশ্বাসে—যে আমায় টেনে নিয়ে যায় ফিনিশিং লাইন পর্যন্ত।

# তোমাদের কাছে বৃষ্টি মানে জানালার পাশে কফি আর রোমান্টিক গান; আর ক্যাডেটদের কাছে বৃষ্টি মানে কর্দমাক্ত মাঠে ইন্টার-হাউস ফুটবলের সেই মরণপণ লড়াই, যেখানে স্লাইডিং ট্যাকল দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর পর নিজের কাদা মাখা জার্সিটাকেও পৃথিবীর দামী পোশাক মনে হয়।

# তোমরা ডাইনিং টেবিলের খাবার নিয়ে হাজারটা অভিযোগ করো, আর ক্যাডেটরা ক্যাডেটরা এক বাটি ডাল আর শক্ত পরোটার মাঝেও কীভাবে আড্ডা জমিয়ে হাসতে হাসতে পেট ভরানো যায়। কারণ আমাদের তৃপ্তি খাবারে নয়, সাথে বসে থাকা টেবিলমেটদের হাসিতে।

# তোমাদের কাছে হয়তো ব্যক্তিগত স্পেস বা ‘প্রাইভেসি’ খুব জরুরি। আর ক্যাডেটদের কাছে ‘প্রাইভেসি’ মানে এক রুমে বসে হাউসের সব বন্ধুর সাথে ফিসফিস করে শেয়ার করা গোপন কোনো স্মৃতি। আমরা একা থাকতে শিখিনি, আমরা শিখেছি ভিড়ের মাঝেও নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিয়ে কীভাবে “এক” হতে হয়।

# তোমরা হয়তো দামী পারফিউম মেখে ডেটে যাও, আর আমরা ক্যাডেটরা সারা গায়ে জেসমিন পাউডার মেখে প্রিপারেশন নিই কোনো ইন্টার-হাউস কালচারাল কম্পিটিশনের জন্য। ক্যাডেটরা হাততালি কোনো বাইরের মানুষের জন্য নয়, সেটা কেবল নিজের হাউজের সম্মান রক্ষার জন্য।

> কষ্ট হলে তোমরা হয়তো ফেসবুকে স্যাড মিউজিক দিয়ে স্টোরি দাও, আর আমরা ক্যাডেটরা হয়তো রাতের অন্ধকারে বাথরুমে গিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু ঝরিয়ে চোখ মুছে এসে আবার হাসিমুখে বন্ধুকে টিজ করি। ক্যাডেটরা ভেঙে পড়তে শিখিনি, শিখেছি একে অপরের কাঁধ হয়ে দাঁড়াতে।

# তোমরা যখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকো, আমরা ক্যাডেটরা তখন আকাশ দেখি। আমরা জানি, গোধূলির পর যখন প্রেপের ঘণ্টা বাজে, তখন ওই আকাশের রংটা ঠিক কতটা মন খারাপ করা হতে পারে।

# তোমরা ফেসবুকের নোটিফিকেশনে ভালোবাসা খোঁজো, আর আমরা ক্যাডেটরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করি একখানা চিঠির জন্য, কিংবা আইটেলের বাটন ফোনে ওই ছয় মিনিটের জন্য, যেখানে “মা” ডাকতেই অর্ধেক সময় পার হয়ে যায়। আমরা ক্যাডেটরা জানি, এক ফোঁটা গলার স্বর শোনার জন্য নব্বই দিন অপেক্ষা করার তৃষ্ণাটা ঠিক কতটা তীব্র।

# তোমরা কোনোদিন এক টুকরা সুইট পাঁচজনে মিলে ভাগ করে খাওয়ার তৃপ্তিটা বুঝবে না। তোমরা জানো না, রাতের বেলা হাউস চেকিংয়ের পর কম্বল মুড়ি দিয়ে চার-পাঁচজন মিলে লুকানো ফোনে চ্যাম্পিয়নস লীগের খেলা দেখার মাঝে কী রাজকীয় সুখ লুকিয়ে থাকে। আমাদের কাছে বন্ধুত্ব মানে স্রেফ আড্ডা নয়, আমাদের বন্ধুত্ব মানে নিজের একমাত্র সুইটটাও নিঃসংকোচে বন্ধুর মুখে তুলে দেওয়া।

# তোমরা যখন কোচিংয়ে দেরি করে গেলে স্রেফ একটা বকুনি খাও, আমরা ক্যাডেটরা তখন এক মিনিট দেরির জন্য পিচঢালা রাস্তায় ‘ফ্রগ জাম্প’ দেই। সেই হাঁটু ছড়ে যাওয়া রক্ত আর ঘাম যখন একাকার হয়ে যায়, তখন আমরা ক্যাডেটরা একে অপরকে গালি দেই না, বরং পাশ থেকে বন্ধুটা ফিসফিস করে বলে, “আর একটু মামা, আর মাত্র দশটা জাম্প!” এই যে একে অপরকে টেনে তোলা, এটাই আমাদের মেরুদণ্ড তৈরি করে দেয়। আমরা ক্যাডেটরা হারতে শিখিনি, আমরা ক্যাডেটরা শিখেছি ধুলোবালি মেখে আবার উঠে দাঁড়াতে।

# তোমরা হয়তো স্কুল শেষ করে পিকনিক করো, আর আমরা ক্যাডেটরা যখন ছয় বছর শেষ হয়, তখন সেই বিদায়টা হয় এক একটা বিচ্ছেদের মতো। যে ছেলেটার সাথে ছয় বছর একই ডরমিটরিতে পিঠাপিঠি ঘুমানো হয়েছে, যাদের সাথে একই বালতিতে মুড়ি পার্টি করা হয়েছে, তাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় মনে হয় শরীরের একটা অংশ ছিঁড়ে যাচ্ছে। সেই শেষ ডিনার, সেই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদা—যেখানে সিনিয়র-জুনিয়র ভেদাভেদ ভুলে সবাই একাকার হয়ে যায়, সেই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য কজনার হয়?

> ক্যাডেট লাইফ আমাদের শুধু অফিসার হতে শেখায় না, ক্যাডেট লাইফ আমাদের মানুষ হতে শেখায়। তোমরা হয়তো অনেক বড় ক্যারিয়ার গড়বে, অনেক টাকা কামাবে; কিন্তু আমরা ক্যাডেটরা শিখি বিপদে পড়লে অন্যের জন্য বুক পেতে দিতে। আমাদের “লাইফ সেট” মানে ব্যাংক ব্যালেন্স নয়, আমাদের “লাইফ সেট” মানে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বিপদে পড়লে কেবল একটা ফোন কলেই ডজনখানেক ভাই এসে পাশে দাঁড়ানো।

আজ যখন সিভিল লাইফে এসে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেখি, তখন কেন জানি ওই রুক্ষ লাল মাটির ক্যাম্পাসটাই বেশি টানে। আমাদের শৈশবটা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে আমাদের দেওয়া হয়েছে এক একটা পাহাড়সম ব্যক্তিত্ব। আমরা হয়তো রোবটের মতো কথা বলি, কিন্তু আমাদের বুকের বাঁ পাশটা অনেক বেশি স্পন্দিত হয় অন্যের কষ্টে।
হ্যাঁ ভাই, আমাদের লাইফ “set”। তবে সেটা কোনো বিসিএস বা অফিসার হওয়ার নিশ্চয়তায় নয়। আমাদের লাইফ set কারণ আমরা জানি, যদি কোনোদিন পৃথিবীর সব সম্পদ হারিয়েও ফেলি, তবুও আমার এই ক্যাডেট লাইফের একটা বন্ধু আছে যার দরজায় আমি মাঝরাতে গিয়ে লাথি মারলে সে বিরক্ত হবে না, বরং জড়িয়ে ধরে বলবে, “ডোন্ট worry মামা, আমরা তো আছি!”

হ্যাঁ ভাই, আমরা ক্যাডেট। আমাদের গল্পটা একটু অন্যরকম। এখানে ইমোশনগুলো লুকানো থাকে খাকিতে থাকা মেটালের পেছনে, আর ভালোবাসাটা মিশে থাকে জুতো পলিশের ব্রাশের টানে। এই ছয় বছর আমাদের শুধু পড়াশোনা করায় না, আমাদের শিখিয়ে দেয়—জীবন মানে শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবা নয়, জীবন মানে পাশের মানুষটার হাত শক্ত করে ধরা।

এই আত্মবিশ্বাস, এই ভ্রাতৃত্ব আর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কোনো সিলেবাসে থাকে না। এটা কেবল ক্যাডেট কলেজের ওই কয়েক একর মাটিতেই জন্মায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

পঞ্চগড়ে উপজেলা পরিষদে এমপির পরিদর্শন কক্ষের উদ্বোধন

নিঃসঙ্গতার আড়ালে লুকানো অদম্য শক্তি, ত্যাগ আর আজীবনের ভ্রাতৃত্বের গল্প

“ক্যাডেট লাইফ: নিঃসঙ্গতার ভেতর জন্ম নেওয়া ভ্রাতৃত্বের অদেখা মহাকাব্য”

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:০১:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টারঃ ক্যাডেট কলেজ মানে শুধু ডিসিপ্লিন নয়, এটা আসলে এক মস্ত বড় “নিঃসঙ্গতার উৎসব”, যেখানে আমরা যারা ক্যাডেট এ পড়ি (ক্যাডেটরা ) সবাই একা হয়েও কখনো একা নই। সবাই যখন বলে, “তোদের (ক্যাডেট দের) তো লাইফ সেট,” তখন মনের ভেতরটা এক অদ্ভুত বিষাদে ছেয়ে যায়। কেউ দেখে না সেই বারো-তেরো বছর বয়সের ছোট ছেলেটাকে, যে প্রথমবার মায়ের আঁচল ছেড়ে ক্যাডেট কলেজের লোহার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল। কেউ দেখে না সেই পিচ্চি বাচ্চাটার কান্নায় ভেজা বালিশ, যে মাঝরাতে বাথরুমে গিয়ে ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে ডুকরে কেঁদেছিল যাতে পাশের বেডের বন্ধুটা টেরও না পায় সে তার মাকে মিস করছে। সেই চোখের জল মুছে পরদিন সকালে আবার খটখটে অক্সফোর্ড জুতা পরে প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘সাবধান হতে শেখার নামই ‘ক্যাডেট লাইফ।

# তোমরা যখন এসি রুমে বসে ইউটিউবে ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ শোনো, ক্যাডেটরা ক্যাডেটরা তখন পিটি গ্রাউন্ডে ভোরের কুয়াশার মাঝে নিজের ফুসফুসটাকে শেষ সীমানা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাই। ক্যাডেটদের মোটিভেশন কোনো ভিডিওতে থাকে না, থাকে পাশের ক্লাসমেটের হাপানি ভরা নিঃশ্বাসে—যে আমায় টেনে নিয়ে যায় ফিনিশিং লাইন পর্যন্ত।

# তোমাদের কাছে বৃষ্টি মানে জানালার পাশে কফি আর রোমান্টিক গান; আর ক্যাডেটদের কাছে বৃষ্টি মানে কর্দমাক্ত মাঠে ইন্টার-হাউস ফুটবলের সেই মরণপণ লড়াই, যেখানে স্লাইডিং ট্যাকল দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর পর নিজের কাদা মাখা জার্সিটাকেও পৃথিবীর দামী পোশাক মনে হয়।

# তোমরা ডাইনিং টেবিলের খাবার নিয়ে হাজারটা অভিযোগ করো, আর ক্যাডেটরা ক্যাডেটরা এক বাটি ডাল আর শক্ত পরোটার মাঝেও কীভাবে আড্ডা জমিয়ে হাসতে হাসতে পেট ভরানো যায়। কারণ আমাদের তৃপ্তি খাবারে নয়, সাথে বসে থাকা টেবিলমেটদের হাসিতে।

# তোমাদের কাছে হয়তো ব্যক্তিগত স্পেস বা ‘প্রাইভেসি’ খুব জরুরি। আর ক্যাডেটদের কাছে ‘প্রাইভেসি’ মানে এক রুমে বসে হাউসের সব বন্ধুর সাথে ফিসফিস করে শেয়ার করা গোপন কোনো স্মৃতি। আমরা একা থাকতে শিখিনি, আমরা শিখেছি ভিড়ের মাঝেও নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিয়ে কীভাবে “এক” হতে হয়।

# তোমরা হয়তো দামী পারফিউম মেখে ডেটে যাও, আর আমরা ক্যাডেটরা সারা গায়ে জেসমিন পাউডার মেখে প্রিপারেশন নিই কোনো ইন্টার-হাউস কালচারাল কম্পিটিশনের জন্য। ক্যাডেটরা হাততালি কোনো বাইরের মানুষের জন্য নয়, সেটা কেবল নিজের হাউজের সম্মান রক্ষার জন্য।

> কষ্ট হলে তোমরা হয়তো ফেসবুকে স্যাড মিউজিক দিয়ে স্টোরি দাও, আর আমরা ক্যাডেটরা হয়তো রাতের অন্ধকারে বাথরুমে গিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু ঝরিয়ে চোখ মুছে এসে আবার হাসিমুখে বন্ধুকে টিজ করি। ক্যাডেটরা ভেঙে পড়তে শিখিনি, শিখেছি একে অপরের কাঁধ হয়ে দাঁড়াতে।

# তোমরা যখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকো, আমরা ক্যাডেটরা তখন আকাশ দেখি। আমরা জানি, গোধূলির পর যখন প্রেপের ঘণ্টা বাজে, তখন ওই আকাশের রংটা ঠিক কতটা মন খারাপ করা হতে পারে।

# তোমরা ফেসবুকের নোটিফিকেশনে ভালোবাসা খোঁজো, আর আমরা ক্যাডেটরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করি একখানা চিঠির জন্য, কিংবা আইটেলের বাটন ফোনে ওই ছয় মিনিটের জন্য, যেখানে “মা” ডাকতেই অর্ধেক সময় পার হয়ে যায়। আমরা ক্যাডেটরা জানি, এক ফোঁটা গলার স্বর শোনার জন্য নব্বই দিন অপেক্ষা করার তৃষ্ণাটা ঠিক কতটা তীব্র।

# তোমরা কোনোদিন এক টুকরা সুইট পাঁচজনে মিলে ভাগ করে খাওয়ার তৃপ্তিটা বুঝবে না। তোমরা জানো না, রাতের বেলা হাউস চেকিংয়ের পর কম্বল মুড়ি দিয়ে চার-পাঁচজন মিলে লুকানো ফোনে চ্যাম্পিয়নস লীগের খেলা দেখার মাঝে কী রাজকীয় সুখ লুকিয়ে থাকে। আমাদের কাছে বন্ধুত্ব মানে স্রেফ আড্ডা নয়, আমাদের বন্ধুত্ব মানে নিজের একমাত্র সুইটটাও নিঃসংকোচে বন্ধুর মুখে তুলে দেওয়া।

# তোমরা যখন কোচিংয়ে দেরি করে গেলে স্রেফ একটা বকুনি খাও, আমরা ক্যাডেটরা তখন এক মিনিট দেরির জন্য পিচঢালা রাস্তায় ‘ফ্রগ জাম্প’ দেই। সেই হাঁটু ছড়ে যাওয়া রক্ত আর ঘাম যখন একাকার হয়ে যায়, তখন আমরা ক্যাডেটরা একে অপরকে গালি দেই না, বরং পাশ থেকে বন্ধুটা ফিসফিস করে বলে, “আর একটু মামা, আর মাত্র দশটা জাম্প!” এই যে একে অপরকে টেনে তোলা, এটাই আমাদের মেরুদণ্ড তৈরি করে দেয়। আমরা ক্যাডেটরা হারতে শিখিনি, আমরা ক্যাডেটরা শিখেছি ধুলোবালি মেখে আবার উঠে দাঁড়াতে।

# তোমরা হয়তো স্কুল শেষ করে পিকনিক করো, আর আমরা ক্যাডেটরা যখন ছয় বছর শেষ হয়, তখন সেই বিদায়টা হয় এক একটা বিচ্ছেদের মতো। যে ছেলেটার সাথে ছয় বছর একই ডরমিটরিতে পিঠাপিঠি ঘুমানো হয়েছে, যাদের সাথে একই বালতিতে মুড়ি পার্টি করা হয়েছে, তাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় মনে হয় শরীরের একটা অংশ ছিঁড়ে যাচ্ছে। সেই শেষ ডিনার, সেই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদা—যেখানে সিনিয়র-জুনিয়র ভেদাভেদ ভুলে সবাই একাকার হয়ে যায়, সেই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য কজনার হয়?

> ক্যাডেট লাইফ আমাদের শুধু অফিসার হতে শেখায় না, ক্যাডেট লাইফ আমাদের মানুষ হতে শেখায়। তোমরা হয়তো অনেক বড় ক্যারিয়ার গড়বে, অনেক টাকা কামাবে; কিন্তু আমরা ক্যাডেটরা শিখি বিপদে পড়লে অন্যের জন্য বুক পেতে দিতে। আমাদের “লাইফ সেট” মানে ব্যাংক ব্যালেন্স নয়, আমাদের “লাইফ সেট” মানে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বিপদে পড়লে কেবল একটা ফোন কলেই ডজনখানেক ভাই এসে পাশে দাঁড়ানো।

আজ যখন সিভিল লাইফে এসে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেখি, তখন কেন জানি ওই রুক্ষ লাল মাটির ক্যাম্পাসটাই বেশি টানে। আমাদের শৈশবটা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে আমাদের দেওয়া হয়েছে এক একটা পাহাড়সম ব্যক্তিত্ব। আমরা হয়তো রোবটের মতো কথা বলি, কিন্তু আমাদের বুকের বাঁ পাশটা অনেক বেশি স্পন্দিত হয় অন্যের কষ্টে।
হ্যাঁ ভাই, আমাদের লাইফ “set”। তবে সেটা কোনো বিসিএস বা অফিসার হওয়ার নিশ্চয়তায় নয়। আমাদের লাইফ set কারণ আমরা জানি, যদি কোনোদিন পৃথিবীর সব সম্পদ হারিয়েও ফেলি, তবুও আমার এই ক্যাডেট লাইফের একটা বন্ধু আছে যার দরজায় আমি মাঝরাতে গিয়ে লাথি মারলে সে বিরক্ত হবে না, বরং জড়িয়ে ধরে বলবে, “ডোন্ট worry মামা, আমরা তো আছি!”

হ্যাঁ ভাই, আমরা ক্যাডেট। আমাদের গল্পটা একটু অন্যরকম। এখানে ইমোশনগুলো লুকানো থাকে খাকিতে থাকা মেটালের পেছনে, আর ভালোবাসাটা মিশে থাকে জুতো পলিশের ব্রাশের টানে। এই ছয় বছর আমাদের শুধু পড়াশোনা করায় না, আমাদের শিখিয়ে দেয়—জীবন মানে শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবা নয়, জীবন মানে পাশের মানুষটার হাত শক্ত করে ধরা।

এই আত্মবিশ্বাস, এই ভ্রাতৃত্ব আর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কোনো সিলেবাসে থাকে না। এটা কেবল ক্যাডেট কলেজের ওই কয়েক একর মাটিতেই জন্মায়।