তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি -ঃ রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় বিস্তীর্ণ ফসলী জমি ধ্বংস করে অবৈধ পুকুর খননের চলছে মহোৎসব। এদিকে একের পর এক এসব অবৈধ পুকুর খননে এলাকার কৃষক সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।কিন্ত্ত প্রশাসনের প্রশ্নবিদ্ধ ভুমিকার কারনে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ তো হচ্ছেই না, অধিকাংশক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগীতামুলক ভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে ফসলী জমি রক্ষায় বাধা দিতে গেলেই ভেঁকু দালাল ও মাটি দস্যুদের হামলার শিকার হচ্ছে। তবে নিরহ কৃষকেরা প্রশাসনের সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, ইতমধ্যে তানোরের কামারগাঁ ইউপির হাতিশাইল লব্যাতলা, তালন্দ ইউপির মোহর ও নারায়নপুর, মোহনপুর উপজেলার বেড়াবাড়ী ও শেঁয়ালখোলা, গোদাগাড়ীর দেওপাড়া ইউপির পালপুর ও কদমশহর এলাকায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে। এদিকে গত ২১মে শনিবার সকালে পবায় কৃষি জমিতে অবৈধ পুকুর খননকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নারী ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানসহ পাঁচজন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে একজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিন সকালে উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের মাড়িয়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে। পবা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুকুরখনন কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। এ ঘটনায় গ্রামবাসি, ভেঁকু দালাল, পুকুরখনন সিন্ডিকেট ও মাটিদস্যুদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এদিকে জোর করে আবাদ যোগ্য জমি ও আমবাগান কেটে অবৈধ পুকুরখননের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে। জমির মালিক আনছার আলী এ অভিযোগ করেন। এছাড়াও মারপিটের অভিযোগেও পবা থানায় পৃথক অভিযোগ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ভোগদখলীয় কৃষি জমিতে জোরপুর্বক চন্দ্রিমা থানার কালচিকা গ্রামের নবাব আলীর পুত্র ভেুকু ব্যবসায়ী ওমর ফারুক ওরফে ফারদিন পুকুর খনন করতে থাকে। তার সঙ্গে মাড়িয়া গ্রামের ইব্রাহিম আলীর পুত্র বাবুল হোসেন ও মৃত পাতান আলীর পুত্র সাজ্জাদ আলী অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে এই পুকুরখনন করছে। পুকুর খননে বেশ কয়েকদিন থেকে বাঁধা দেয়া সত্বেও তারা খননকার্য অব্যাহত রাখে। খননে বাধা দিলে খননকারিরা প্রাণ নাশের হুমকি দেয়। পবা থানায় অভিযোগ দিয়েও পুকুর খনন বন্ধে ও প্রাণনাশের হুমকির বিষয়ে কোন ধরণের পদক্ষেপ নেয়নি।
গত শনিবার সরেজমিন ওই পুকুর পাড়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা হয় তারায় বলেন প্রতি বছরই এরা এই এলাকায় কৃষি জমি, ভিটা জমি ও আমবাগান কেটে পুকুর খনন করে আসছে। বাধা দিতে গেলেই হামলা-মামলা পুলিশি নির্যাতনের ভয় দেখায়। এ অবস্থায় এদিন সকালে জমি ভোগদখলকারি, ভেঁকু দালাল ও অবৈধ পুকুর খননকারিদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এর এক পর্যায়ে ভেঁকু দালাল, পুকুর খননকারি, জমি মালিকসহ গ্রামবাসী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।এতে নারীসহ পাঁচজন আহত হন। আহতরা হলেন, পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের তিন মেয়াদের চেয়ারম্যান মনছুর রহমান, আনছার আলীর পুত্র মাসুদ রানা, মাসুদ রানা মা সালেহার বেগম, মৃত পাতাল মন্ডলের পুত্র ইনছের ও সাইদুল ইলাম। এদের মধ্যে মাসুদ রানাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। রাজশাহীর বিভিন্ন
উপজেলায় বেশি লাভের আশায় আমের গাছ কেটে ভিটা জমিতে দেদারছে পুকুর খনন করা হচ্ছে। ভূমি আইন উপেক্ষা করে অবাধে চলছে খননকাজ। রাত দিন সমানে পুকুর খনন করায় কমে যাচ্ছে বাগানসহ তিন ফসলী জমির পরিমাণ।পাশাপাশি মাটির চাহিদা মেটাতে সারা রাত মাটি কেটে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে টপ সয়েল। বিক্রি করা মাটি পরিবহণের ভারি ডামট্রাক ও ট্রাক্টরের চলাচলে নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ টাকার গ্রামীণ পাকা ও কাঁচা রাস্তা সড়ক। এছাড়াও মাটির ট্রাক্টরে প্রতিনিয়তই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। গত কয়েকদিন আগে এই মাটির ট্রাক্টরে কারণে নওহাটায় সড়ক দুর্ঘটনায় চারজন মারা যায়। যারমধ্যে একই পরিবারের শিশুকন্যাসহ স্বামী-স্ত্রী রয়েছে।
রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর খননের কারণে আবাদি জমি কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খননের জন্য ধানের যে জমি কমেছে,তার চেয়ে বেশী ক্ষতি হচ্ছে আবাদে। জলাবদ্ধতার কারণে এক তৃতীয়াংশ জমি অনাবাদি হয়ে পরিত্যাক্ত জমিতে পরিণত হচ্ছে। গত ১০ বছরে বোরো ধানের জমি কমতে কমতে অর্ধেকে নেমে এসেছে। পবা উপজেলার মতো রাজশাহীর সব উপজেলায় শুরু হয়েছে পুকুরখনন। এই অঞ্চল এক সময় বোরো ধানের জন্য বিখ্যাত হলেও, এখন সেই খ্যাতি আর নেই। অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে বাগান, তিন ফসলি ও ধানের জমিতে পুকুর খনন বন্ধ করতে পারছে না প্রশাসন। বর্তমানে রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার খালে বিলে যেদিকে চোখ যায় শুধু বোরো জমিতে দেখা মেলে পুকুর আর পুকুর। এখন বোরো জমি বাদেও তিন ফসলি ও বিভিন্ন ফলদ বাগান ধ্বংস করে তা পুকুরে পরিণত করা হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। গত দশ বছর ধরে এই এলাকায় চলছে পুকুর খননের হিড়িক। এসব পুকুর খননের বিষয়ে জেলা প্রশাসন দুষছেন উপজেলা প্রশাসনকে, আবার উপজেলা প্রশাসন দুষছেন জেলা প্রশাসনকে। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে সব ধরনের পুকুর খননের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাজারী রয়েছে। তারপরও উপজেলা প্রশাসনের মদদে ও উদাসিনতার কারণে বারবার একই ব্যক্তিরা ফসলী ও বোরোর জমিতে পুকুর খনন করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে আবার উপজেলা প্রশাসন, বলছেন থানার সহযোগিতায় পুকুর খনন করা হয়। আর পুকুর খননকারীরা বলছেন, পুকুর খনন করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও থানা শেষে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে টাকা দিতে হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জনকল্যাণে পুকুর খনন নয়, মাটি বিক্রির জন্যই এই পুকুর খননের হিড়িক।













