
জেলা প্রতিনিধি, পঞ্চগড়: পঞ্চগড়ের নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি দেশীয় পণ্যের বাজারজাতকরণ, প্রচার ও বিক্রির সুযোগ বাড়াতে প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছে ‘বাবুই নারী উদ্যোক্তা হাট’। স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের পণ্যের পরিচিতি বৃদ্ধি, সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে পঞ্চগড় সরকারি অডিটোরিয়াম চত্বরে সাপ্তাহিক এ হাটের উদ্বোধন করেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন, পুলিশ সুপার আবু সাইম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা সুলতানাসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি ও নারী উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম দিনেই অর্ধশত নারী উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ
উদ্বোধনের প্রথম দিনেই ‘বাবুই নারী উদ্যোক্তা হাটে’ অংশ নেন প্রায় অর্ধশত নারী উদ্যোক্তা। তাঁদের সাজানো স্টলে স্থান পায় হাতে তৈরি হস্তশিল্প, ঘরে তৈরি খাদ্যসামগ্রী, পোশাক, প্রসাধনী, চিত্রকর্মসহ নানা ধরনের শৌখিন ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য।
নিজেদের তৈরি পণ্য ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরতে পেরে উদ্যোক্তাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। পাশাপাশি হাটে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
আয়োজকদের মতে, অনেক নারী ঘরে বসে সৃজনশীল ও মানসম্মত পণ্য তৈরি করলেও উপযুক্ত বাজার, প্রচার এবং বিক্রির সুযোগের অভাবে তাঁদের ব্যবসা প্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে নিতে পারেন না। এ ধরনের হাট তাঁদের সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
অনলাইন ব্যবসার পাশাপাশি সরাসরি বিক্রির সুযোগ
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনেক নারী উদ্যোক্তা তাঁদের পণ্য বিক্রি করছেন। তবে অনলাইনে পণ্যের প্রচারের পাশাপাশি সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের গুণগত মান তুলে ধরা এবং ক্রেতাদের মতামত জানার সুযোগও ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
‘বাবুই নারী উদ্যোক্তা হাট’ সেই সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্দিষ্ট স্থানে পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা থাকায় উদ্যোক্তারা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে নিজেদের পণ্য তুলে ধরতে পারবেন। একই সঙ্গে ক্রেতারাও পণ্য দেখে, মান যাচাই করে এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে কেনাকাটা করার সুযোগ পাবেন।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের পথ আরও সুগম হতে পারে।
কেন ‘বাবুই’ নামকরণ?
বাবুই পাখি তার নিপুণভাবে বাসা তৈরির দক্ষতার জন্য পরিচিত। পাখিটির সেই সৃজনশীলতা, ধৈর্য ও পরিশ্রমের ভাবনা থেকেই হাটটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বাবুই নারী উদ্যোক্তা হাট’।
আয়োজকরা জানান, বাবুই পাখি যেমন যত্ন ও দক্ষতার সঙ্গে বাসা তৈরি করে, তেমনি নারী উদ্যোক্তারাও শ্রম, মেধা ও সৃজনশীলতা দিয়ে তাঁদের প্রতিটি পণ্য তৈরি করেন। এই ভাবনাকে ধারণ করেই ‘বাবুই’ নামটি বেছে নেওয়া হয়েছে।
তাঁরা আরও জানান, বাবুইকে পঞ্চগড় জেলার নারী উদ্যোক্তাদের একটি সম্মিলিত ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকার উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
নারী উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে জেলা প্রশাসন
অনুষ্ঠানে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন বলেন, নারী উদ্যোক্তারা তাঁদের পণ্যের গুণগত মান ও বৈচিত্র্য বজায় রেখে এ হাটে পণ্য বিক্রি করবেন। তাঁদের এ উদ্যোগে জেলা প্রশাসন পাশে থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
জেলা প্রশাসনের এ সহযোগিতার আশ্বাস স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, পণ্যের মান বজায় রাখা, ক্রেতাদের আস্থা অর্জন এবং নিয়মিত বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে নতুন সম্ভাবনা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করবে। এর মাধ্যমে পরিবারে তাঁদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে। সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী হিসেবে নারীরা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম—এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তার প্রতিফলন ঘটবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন শুধু ব্যক্তিগত আয় বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার বিষয়ও জড়িত। নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়লে তাঁরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখতে পারবেন।
প্রতি শুক্রবার বসবে ‘বাবুই নারী উদ্যোক্তা হাট’
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পঞ্চগড় সরকারি অডিটোরিয়াম চত্বরে বসবে ‘বাবুই নারী উদ্যোক্তা হাট’। আগ্রহী ক্রেতারা এ সময়ে হাটে এসে নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য দেখতে ও কিনতে পারবেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, নিয়মিত এ আয়োজনের মাধ্যমে আরও বেশি নারী উদ্যোক্তা যুক্ত হবেন এবং তাঁদের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে। পাশাপাশি পঞ্চগড়ের স্থানীয় পণ্য ও নারী উদ্যোক্তাদের সৃজনশীল কাজ বৃহত্তর পরিসরে পরিচিতি পাবে।
স্থানীয় অর্থনীতি ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন প্ল্যাটফর্ম
পঞ্চগড়ে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া ‘বাবুই নারী উদ্যোক্তা হাট’ কেবল পণ্য কেনাবেচার স্থান নয়; এটি স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, পণ্যের প্রচার, ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা অনুসন্ধানের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে নিয়মিত আয়োজন, ক্রেতাদের অংশগ্রহণ, পণ্যের মান বজায় রাখা, কার্যকর প্রচার এবং উদ্যোক্তাদের ধারাবাহিক সহযোগিতার ওপর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে ‘বাবুই নারী উদ্যোক্তা হাট’ পঞ্চগড়ের নারী উদ্যোক্তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ সুগম করার পাশাপাশি জেলার স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে—এমন প্রত্যাশা আয়োজক ও সংশ্লিষ্টদের।












