
নিজস্ব প্রতিবেদক: চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার অলিপুর গ্রাম,, একসময় যোগাযোগ ব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। বর্তমানে গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ উন্নত। শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি ও সামাজিক নানা ক্ষেত্রে এ গ্রামের মানুষ নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, সংবাদকর্মী এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের সাংগঠনিক নেতাসহ বিভিন্ন পেশায় ছড়িয়ে রয়েছেন অলিপুরের কৃতি সন্তানেরা। আরো রয়েছে এই গ্রামের অনেক কৃতি সন্তান যারা মধ্যেপ্রাচ্য হতে শুরু করে ইউরোপ, আমেরিকার প্রবাসী। যারা সফল রেমিটেন্স যোদ্ধা হিসেবে দেশীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন।
গ্রামে বর্তমানে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কেন্দ্রীয় মসজিদসহ চারটি মসজিদ ও মাদ্রাসা। তবে শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু সমস্যা এখনো গ্রামটির সার্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
মেয়েদের শিক্ষার কথা চিন্তা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
[caption id="attachment_35835" align="aligncenter" width="225"]
অলিপুর-উচ্চ-বিদ্যালয়-ভবন.[/caption]
মেয়েদের শিক্ষার কথা চিন্তা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়
একসময় অলিপুর গ্রামে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করতে শিক্ষার্থীদের ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হতো। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য দূরের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ছিল নানা প্রতিবন্ধকতায় ভরা। ফলে অনেক পরিবার মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলত। এতে গ্রামের নারী শিক্ষার হারও ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে অলিপুরের কৃতি সন্তান মরহুম ইঞ্জিনিয়ার আতাউর রহমান রাঢ়ী গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা নিয়ে ১৯৯৫ সালে অলিপুরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল—গ্রামের ছেলে-মেয়েরা যেন নিজ গ্রামেই মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় এবং বিশেষ করে মেয়েদের পড়াশোনা যেন দূরত্ব বা যাতায়াতের কারণে বন্ধ না হয়ে যায়।
বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষার চেয়ে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা?
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ফলাফল নিয়ে যতটা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, তার পরিবর্তে কে ম্যানেজিং কমিটিতে থাকবেন, কার প্রভাব বেশি থাকবে কিংবা কে কীভাবে নিজের অবস্থান শক্ত করবেন—এ ধরনের বিষয় অনেক সময় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যেও পারস্পরিক দোষারোপের প্রবণতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন কেউ কেউ। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। সর্বশেষ পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে মনে করছেন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা।
এদিকে বিভিন্ন কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমছে। স্থানীয়দের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় যে বিদ্যালয়টি গ্রামের শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল, সেটি তার আগের অবস্থান হারাতে পারে।
মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ
শিক্ষার পাশাপাশি অলিপুরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে মাদক। স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের প্রভাব বাড়ছে এবং বাইরের মাদক কারবারিদেরও আনাগোনা রয়েছে। এতে উঠতি বয়সী তরুণদের একটি অংশ বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে এর মধ্যেই মাদকের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা ও প্রতিরোধের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিবর্গ মিলে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের আটক করে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করার নজিরও অলিপুর গ্রামে রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সচেতন মহলের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, তরুণ সমাজ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে গ্রামকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে।
কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংয়েও শঙ্কা
মাদকের পাশাপাশি উঠতি বয়সী কিছু তরুণের বেপরোয়া আচরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু কিশোরের নৈরাজ্য ও দলবদ্ধ চলাফেরার কারণে এলাকায় অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
অভিভাবকদের মতে, এসব সমস্যা শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এজন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগেই বদলাতে পারে অলিপুর
অলিপুরের মানুষ মনে করেন, গ্রামের সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক ঐক্য ও সদিচ্ছা। রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত মতপার্থক্য ভুলে সবাই যদি একটি প্ল্যাটফর্মে এসে গ্রামের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন, তাহলে অলিপুরকে একটি আদর্শ গ্রামে পরিণত করা সম্ভব।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ক্ষমতার ভাগাভাগি কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি, মাদক নির্মূল, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ এবং নারী ও শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক সবার প্রধান লক্ষ্য।
তাদের ভাষায়, যে গ্রামের সন্তানরা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন, সেই গ্রাম কেন পিছিয়ে থাকবে? প্রয়োজন শুধু সম্মিলিত উদ্যোগ, সঠিক নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাজ করার মানসিকতা।
সচেতন মহল মনে করেন, মরহুম ইঞ্জিনিয়ার আতাউর রহমান রাঢ়ীর যে স্বপ্ন থেকে অলিপুরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই স্বপ্নকে সামনে রেখে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া গেলে বিদ্যালয়টি আবারও ফিরে পেতে পারে তার হারানো প্রাণচাঞ্চল্য। আর শিক্ষা, মাদকমুক্ত পরিবেশ, নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে অলিপুর হয়ে উঠতে পারে একটি শিক্ষিত, মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও আদর্শ গ্রাম।
<p style="text-align: center; ">কার্যালয়: ৩৯/১, বঙ্গবন্ধুএভিনিউ, খদ্দর মার্কেট (৬ষ্ঠ তলা), রুম নং- ০৩, ঢাকা-১০০০। যোগাযোগ: ০১৭১১-১০ ৪২ ৭২, +৮৮০ ৯৬ ৩৮ ৬৭ ৩৩ ৩০, E-mail:crimeletter24@gmail.com https://www.crimeletter.com</p><p style="text-align: center; "><span style="font-family: inherit; font-weight: inherit;">সম্পাদক ও প্রকাশক : নাজমুল হক, নির্বাহী সম্পাদক:সুরাইয়া আক্তার (সুমি)</span></p>
কপিরাইট - ক্রাইমলেটার.কম