নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ: শিল্প ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নগরী নারায়ণগঞ্জে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েকদিন ধরে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
শিল্প মালিকদের দাবি, গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ না থাকায় অনেক কারখানা তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। কোনো কোনো শিল্পকারখানায় উৎপাদন নেমে এসেছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের নিচে। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে কারখানা পরিচালনার খরচ ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত :
নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি, বিসিক শিল্পনগরী, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দরসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বয়লার, ডাইং, নিটিং ও বিভিন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্যাসের প্রয়োজন হওয়ায় চাপ কমে গেলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা থমকে যাচ্ছে।
শিল্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি সময়মতো ক্রেতার অর্ডার সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্পে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। পূর্বেও নারায়ণগঞ্জের শিল্প মালিকরা গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন এবং সময়মতো রপ্তানি না হলে এয়ার শিপমেন্টের মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
বর্তমান সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতিও যুক্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের শিল্প এলাকায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ৩০–৪০ শতাংশ কম থাকায় নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুই সংকট একসঙ্গে শিল্প উৎপাদনকে চাপে ফেলেছে।
আবাসিক এলাকাতেও গ্যাসের জন্য হাহাকার :
শিল্প এলাকার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকাতেও গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। দেওভোগ, কাশিপুর, বাবুরাইল, পাইকপাড়া, শহীদনগর, নলুয়াপাড়া, ভূঁইয়ারবাগ, চাঁনমারী, ইসদাইর, মাসদাইর, জামতলা ও আশপাশের এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল, কদমতলী, এসও, বার্মাস্ট্যান্ড, মিজমিজি, সিদ্ধিরগঞ্জ বাজার, ওমরপুর, সানারপাড়, মৌচাক, নিমাইকাশারী ও সিমরাইল এলাকার বাসিন্দারা গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
অনেক এলাকায় দিনের বেলায় গ্যাস না থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক পরিবারকে রান্নার সময় পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কেউ ভোররাতে, কেউ গভীর রাতে গ্যাসের অপেক্ষায় রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি, বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে পারিবারিক ব্যয়ও বাড়ছে।
শুধু বাসাবাড়ি নয়, হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও সংকটের প্রভাব পড়েছে। নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে রোগীদের খাবার রান্নায় লাকড়ির চুলা ব্যবহারের ঘটনাও স্থানীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তিতাসের ৮১ হাজার গ্রাহক ভোগান্তিতে :
গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জে তিতাস গ্যাসের বিপুলসংখ্যক গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদেরও সংকটের কথা উঠে এসেছে।
এদিকে জাতীয় পর্যায়েও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির প্রভাব পড়েছে। সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সমস্যাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি এফএসআরইউতে ত্রুটির কারণে আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কমে যায়।
বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, শঙ্কায় কর্মসংস্থান :
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ও জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। দীর্ঘ সময় সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন কমানো, শিফট কমানো কিংবা সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্প উৎপাদন কমে গেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে শ্রমিকদের আয় ও কর্মসংস্থানে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও রপ্তানি কমে গেলে জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্রুত সমাধানের দাবি :
শিল্প মালিক ও সাধারণ গ্রাহকদের দাবি, সংকট মোকাবিলায় নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পনির্ভর এলাকায় গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু শিল্পকারখানা নয়—শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও আরও প্রকট হতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করে শিল্পের উৎপাদন ও নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা হবে।
<p style="text-align: center; ">কার্যালয়: ৩৯/১, বঙ্গবন্ধুএভিনিউ, খদ্দর মার্কেট (৬ষ্ঠ তলা), রুম নং- ০৩, ঢাকা-১০০০। যোগাযোগ: ০১৭১১-১০ ৪২ ৭২, +৮৮০ ৯৬ ৩৮ ৬৭ ৩৩ ৩০, E-mail:crimeletter24@gmail.com https://www.crimeletter.com</p><p style="text-align: center; "><span style="font-family: inherit; font-weight: inherit;">সম্পাদক ও প্রকাশক : নাজমুল হক, নির্বাহী সম্পাদক:সুরাইয়া আক্তার (সুমি)</span></p>
কপিরাইট - ক্রাইমলেটার.কম