
ডেক্স রিপোর্ট : ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার, আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। কালের মহাপরিক্রমায় আজ ২০২১ সালের ১৭ মার্চ ১০১ তম জন্মশতবার্ষিকীতে পদার্পণ করল মৃত্যুঞ্জয়ী এই মহাপুরুষের জন্মশতবার্ষিকী।
বঙ্গবন্ধু ভালো বাসতেন এ দেশের কৃষি, কৃষক, কৃষিবিদদের। তিনি বিশ্বাস করতেন কৃষক ও কৃষিবিদের উন্নয়ন হলে এ দেশের কৃষির উন্নয়ন হবে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- “আমার কৃষক, আমার শ্রমিক দুর্নীতি করে না। সকল শিক্ষিত লোকদের বলব, কৃষক শ্রমিকদের সাথে ইজ্জত এবং সম্মান রেখে কথা বলবেন। কারণ দেশের মালিক ওরাই, ওদের দ্বারাই আপনাদের সংসার চলে। তোমরা আজ লেখাপড়া করেছ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অফিসার হয়েছ তাদের শ্রম আর ঘামের টাকায়।”
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টেকসই কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের ৭ নম্বর আইনের মাধ্যমে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৭৩ সালের ১০ নম্বর অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ধান ব্যতিরেকে বহুমুখী ফসল গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে। পুনর্গঠন করা হয় হর্টিকালচার বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, সিড সার্টিফিকেশন এজেন্সি, রাবার উন্নয়ন কার্যক্রম, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ গবেষণা সমন্বয়ের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। সোনালি আঁশের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে প্রতিষ্ঠা করেন পাট মন্ত্রণালয়।
কালজয়ী এ মহাপুরুষের প্রতিটি গৃহীত পদক্ষেপ আমাদের পথের সন্ধান দিয়েছে, প্রতিটি নির্দেশনা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, বাঙ্গালী জাতিকে দিয়েছে নতুন পথের দিশা। তার সোনার বাংলার ন্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে তারই যোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে দীপ্ত পদে অদম্য অপ্রতিরোধ্য দুর্বার গতিতে।
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন এখন বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত। মুজিবীয় চেতনায় বাংলার কৃষির বিকাশ ঘটুক শতাব্দী থেকে শতাব্দীতে।
শিক্ষা আলোকবর্তিকা স্বরূপ। শিক্ষা উন্নয়নের সোপান। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষিত কোন জাতি অনুন্নত বা পশ্চাৎপদ থেকেছে এমন নজির কোথাও নেই। শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর নিজেকে, তার পরিবেশ-প্রতিবেশ, মানুষ, সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, শিল্পকলা, দেশ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মানুষের জীবন সংগ্রাম, মানব সভ্যতা ইত্যাদি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়। শিক্ষা একজন মানুষকে সচেতন, সংবেদনশীল, নৈতিক, সৃষ্টিশীল, আত্মপ্রত্যয়ী ও মানবিক গুণে গুণান্বিত করে তোলে। তবে এর জন্য থাকা চাই সুশিক্ষা বা সত্যিকার শিক্ষা। আর সুশিক্ষার মূলে থাকে দেশ, মানুষ ও মানবকল্যাণ। অন্য কথায়, ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’-এ আদর্শ। এ সকল ব্যতীত যে শিক্ষা তা শিক্ষার নামে কুশিক্ষা বা খ-িত শিক্ষা। তেমন শিক্ষা কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা এমনকি জঙ্গীবাদের পথ খুলে দেয়। পাকিস্তানী শাসন আমলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালীর জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালীদের জন্য একটি গণতান্ত্রিক, মানবকল্যাণকামী, অসাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক ধাঁচের প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতিবিরোধী বাংলার ছাত্র-সমাজের শিক্ষা আন্দোলন জাতীয় মুক্তির বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখেননি, তিনি একটি উন্নত-সমৃদ্ধ সুখী বাংলাদেশ, তাঁর কথায়, ‘সোনার বাংলার’ স্বপ্নও দেখেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।’ অর্থাৎ দক্ষ, যোগ্য, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, আধুনিক, শিক্ষিত সন্তান বা মানবসম্পদ। আর তা সৃষ্টির জন্য থাকা চাই সত্যিকার মানুষ গড়ার শিক্ষা বা সুশিক্ষা।
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-ভাবনা
বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ’৭২-এর সংবিধানে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ অংশে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-ভাবনা অন্তর্ভুক্ত করে ঐ সংবিধান প্রণীত হয়। ১৭ ধারায় বলা হয় (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য, (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য, (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।
বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাবনা ছিল—একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে চাই স্বাস্থ্যবান জাতি। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতকে শুধু গুরুত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হননি তিনি, ব্যাপক সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।বঙ্গবন্ধুই তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই লক্ষ্যে গৃহীত ১০ শয্যার থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বিশ্বে আজও সমাদৃত মডেল। চিকিৎসক এবং চিকিৎসা খাতে বঙ্গবন্ধুর অবদান
১. সংবিধানে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা পাওয়াকে মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা করেন।
২. আইপিজিএমআর (সাবেক পিজি) হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল হিসেবে স্থাপন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসকরা পোস্টগ্র্যাজুয়েশন করে থাকেন। এই সঙ্গে প্রতিবছর লাখ লাখ রোগীকে উচ্চ মানসম্পন্ন চিকিত্সা প্রদান করা হয়।
৩. বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন্স (বিসিপিএস) প্রতিষ্ঠা। এই প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসকদের ফেলোশিপ প্রদান করা হয়।
৪. স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা।
৫. ১৯৭৩ সালে প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান।
৬. ১৯৭৪ সালে জনস্বাস্থ্য পুষ্টিপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা।
৭. ১৯৭৫ সালের ২৩ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ পুষ্টি পরিষদ’ গঠনের আদেশে স্বাক্ষর করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
৮. বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা।
৯. চিকিত্সকদের সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান। আগে যা দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদায় ছিল।
১০. নার্সিংসেবা ও টেকনোলজির উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা।
১১. উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল নীতি হলো, ‘Prevention is better then cure’—এ নীতিকে বাস্তবায়ন করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিপসম’ নামের প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে রোগ, রোগতত্ত্ব এবং রোগের প্রতিকারবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
১২. বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) প্রতিষ্ঠা।
১৩. ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা।
১৪. জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান স্থাপন।
বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন দেশে মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার মধ্যে তিনি বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। বাস্তবায়ন করেছিলেন অনেক অসাধ্য কর্মসূচির। একটি দেশ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য, বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর একটি সময়োপোযোগী আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। একটি রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় এমন কোনো বিষয় নেই যে তিনি স্পর্শহীন রেখেছেন।
বঙ্গবন্ধু সরকারের উল্লেখযোগ্য কিছু দিক হলো :
মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন : মুক্তি বাহিনীর জওয়ানদের কাজে লাগানোর জন্য বঙ্গবন্ধু ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী, মিলিশিয়া, রিজার্ভ বাহিনী সংগঠনের বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এ ছাড়া দেশ গড়ার বিভিন্ন কাজে যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করেন।
ত্রাণ কার্যক্রম : রিলিফ ও পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু দেশের বিভিন্ন স্থানে জনসংখ্যার ভিত্তিতে মঞ্জুরি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ : মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত অস্ত্র নিজেদের কাছে না রেখে তা ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সমর্পণের আহ্বান জানান। এতে সব মুক্তিযোদ্ধা সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দেন।
স্বাধীন বাংলার প্রশাসনিক পদক্ষেপ : ঢাকা মুক্ত হওয়ার পর একটা প্রশাসনিক শূন্যতা বিরাজ করছিল রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র। নিরাপত্তার বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তনের পর প্রশাসনকে কর্মোপযোগী করে তোলেন।
ভারতীয় বাহিনীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন : ১২ মার্চ ১৯৭২ ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রত্যাবর্তন করে।
১৯৭২ সালের সংবিধান : ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশ যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তারই আদর্শ হিসেবে রচিত হলো রক্তে লেখা এক সংবিধান ৪ নভেম্বর ১৯৭২।
সাধারণ নির্বাচন : ১৯৭৩ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা : বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের জনগণের দ্রারিদ্র্য দূরীকরণ তথা অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে জাতির জনক প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
এই পরিকল্পনার লক্ষ্যগুলো ছিল—
ক. মূল লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য দূরীকরণ। এ জন্য যারা কর্মহীন বা আংশিক কর্মহীন তাদের সবার কর্মসংস্থানের আয়োজন প্রয়োজন। তা ছাড়া জাতীয় আয় বৃদ্ধির সঙ্গে এই আয় বণ্টনের জন্য যথাযথ আর্থিক ও মুদ্রানীতি প্রণয়ন ত্বরান্বিত হওয়া প্রয়োজন।
খ. জনগণের অত্যাবশ্যক পণ্যের চাহিদা যাতে মেটে সে জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর (খাদ্যদ্রব্য, পোশাক, ভোজ্য তেল, কেরোসিন ও চিনি) উত্পাদন বাড়াতে হবে।
গ. কৃষির প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগতকাঠামোতে এমনভাবে রূপান্তর সাধন প্রয়োজন, যাতে খাদ্যশস্যের উত্পাদনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়, কৃষিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং শ্রমশক্তির শহরমুখী অভিবাসন বন্ধ হয়।
পররাষ্ট্রনীতি : বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরী মনোভাব নয়।’ প্রথম তিন মাসের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ ৬৩টি দেশের স্বীকৃতি লাভ। ৩ মাস ২১ দিনের মধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় দুই বছর দুই মাসের মধ্যে। সর্বমোট ১২১টি দেশ স্বীকৃতি প্রদান করে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠন : ইসলামের যথার্থ শিক্ষা ও মর্মবাণী সঠিকভাবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচার-প্রসারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ইসলাম আদর্শের যথাযথ প্রকাশ তথা ইসলামের উদার মানবতাবাদী চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা ছিল জাতির জনকের সুদূরপ্রসারী চিন্তার এক অমিত সম্ভাবনাময় ফসল।
যুদ্ধাপরাধীর বিচার : বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল অর্ডার’ জারি করে। এতে দালাল, যোগসাজশকারী কিংবা কোলাবরেটরদের সংজ্ঞায়িত করা হয় এভাবে—
—প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে বস্তুগত সহযোগিতা প্রদান বা কোনো কথা, চুক্তি ও কার্যাবলির মাধ্যমে হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করা।
—গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধের চেষ্টা করা।
—মুক্তিবাহিনীর তত্পরতার বিরুদ্ধে ও মুক্তিকামী জনগণের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
—পাকিস্তানি বাহিনীর অনুকূলে কোনো বিবৃতি প্রদান বা প্রচারে অংশ নেওয়া এবং পাকিস্তানি বাহিনীর কোনো প্রতিনিধিদল বা কমিটির সদস্য হওয়া। হানাদারদের আয়োজনে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া।
চার ধরনের অপরাধীর বিচার : পরবর্তীকালে একই বছরে এই আইন দুই দফা সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনীতেও চার ধরনের অপরাধীকে ক্ষমা করা হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে নেই, তাদের ক্ষমা করা হয়। কিন্তু যারা লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যা—এই চারটি অপরাধ করেছে, তাদের ক্ষমা করা হয়নি। ১৯৭৩ সালে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৭ হাজার ৪৭১ জনকে দালাল আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে অক্টোবর পর্যন্ত দুই হাজার ৮১৮টি মামলার সিদ্ধান্ত হয়। এতে একজনের মৃত্যুদণ্ডসহ ৭৫২ দালাল দণ্ডিত হয়। তত্কালীন সরকার আইনগত ব্যবস্থা ত্বরিত করার জন্য ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ১১ হাজার আটক থাকে।
উপরন্তু বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালের ১৯ জুলাই ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট’ জারি করেন, যা পরবর্তী সময়ে আইন হিসেবে সংবিধানে সংযোজিত হয় এবং অদ্যাবধি তা বহাল রয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ৪ নভেম্বর সংবিধানের ১২ ও ৩৮ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সংবিধানের ৬৬ ও ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তথাকথিত ধর্ম ব্যবসায়ীদের ভোটাধিকার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার বাতিল করা হয়েছিল।
হজে প্রেরণ : ১৯৭২ সালে সৌদি আরবে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে ছয় সহস্রাধিক বাংলাদেশি মুসলমানকে হজ পালনে প্রেরণ করা হয়।
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি : ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত হয় ‘২৫ বছরমেয়াদি’ বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীচুক্তি।
শিক্ষা কমিশন গঠন : কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন।
যমুনা সেতু : ১৯৭৩ সালের ১৮-২৪ অক্টোবর জাপান সফরকালে জাপানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের সূচনা করেন।
বিভিন্ন সংস্থার সদস্যপদ গ্রহণ : জাতিসংঘের বেশির ভাগ সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্যপদ গ্রহণ।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পুনর্গঠন : স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক সুসজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ : ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ ও ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ প্রদান।
প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন : বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৪-২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক কিছু পদক্ষেপ : ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, পাঁচ হাজার টাকার ওপরে কৃষিঋণ মওকুফকরণ এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে এনে সামাজিক অর্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জমি মালিকানার সিলিং পুনর্নির্ধারণ ছিল ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
স্বাস্থ্যব্যবস্থা : বঙ্গবন্ধু সরকার নগর ভিত্তিক ও গ্রামীণজীবনের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূরীকরণের পদক্ষেপ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৫০০ ডাক্তারকে গ্রামে নিয়োগ করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে আইজিএমআর শাহবাগ হোটেলে স্থানান্তর হয়। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে থানা স্বাস্থ্য প্রকল্প গ্রহণ বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আজও স্বীকৃত।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি : ১৯৭৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশকে শিল্প-সংস্কৃতিবদ্ধ সৃজনশীল মানবিক বাংলাদেশ গঠন এবং বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ধরে রেখে আরো সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশি শিল্পকলা একাডেমি গঠন করেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান।
বৈদেশিক বাণিজ্য শুরু : শূন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারকে শুরু করতে হয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্য। এ ছাড়া জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে বঙ্গবন্ধু তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বের ছাপ রাখতে সমর্থ হন। পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধ এবং বিশ্বশান্তির প্রতি ছিল তাঁর দৃঢ় সমর্থন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে প্রদান করে ‘জুলিওকুরি’ শান্তিপদক।
দুর্নীতির বিরদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা : ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে জাতির ভবিষ্যত্ তমিস্রায় ছেয়ে যাবে। দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোরাচালানি, মজুদদারি, কালোবাজারি ও মুনাফাখোরদের সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু বলে আখ্যায়িত করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এদের শায়েস্তা করে জাতীয় জীবনকে কলুষমুক্ত করতে না পারলে আওয়ামী লীগের দুই যুগের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানের গৌরবও ম্লান হয়ে যেতে পারে।
বিকল্প নেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির সব স্বপ্ন ও ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত করে ফেলেছিল। তাঁর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা শত বাধাবিপত্তির মধ্যেও বাবার আদর্শকে আঁকড়ে ধরে রেখে আবার বাঙালি জাতিকে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
দেশবাসী আশা করে, জাতির জনকের আদর্শ অনুসরণ করে সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সুশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলবে, যেখানে দেশবাসী নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে গড়ে তোলায় উদ্বুদ্ধ হবে। বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবন আমাদের রাজনীতির বড় পাথেয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু আমাদের সব প্রেরণার উত্স। বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমাদের দেশের সব রাজনীতিবিদ সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবেন এটি জনগণের প্রত্যাশা।জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর একই ধারায় জীবনের সব ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছেন। বাস্তবিক অর্থে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। দেশের সব প্রগতিশীল শক্তি জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি সুখী-সমৃদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন, এটিই হোক এবারের জাতীয় শোক দিবসে আমাদের প্রত্যাশা।
<p style="text-align: center; ">কার্যালয়: ৩৯/১, বঙ্গবন্ধুএভিনিউ, খদ্দর মার্কেট (৬ষ্ঠ তলা), রুম নং- ০৩, ঢাকা-১০০০। যোগাযোগ: ০১৭১১-১০ ৪২ ৭২, +৮৮০ ৯৬ ৩৮ ৬৭ ৩৩ ৩০, E-mail:crimeletter24@gmail.com https://www.crimeletter.com</p><p style="text-align: center; "><span style="font-family: inherit; font-weight: inherit;">সম্পাদক ও প্রকাশক : নাজমুল হক, নির্বাহী সম্পাদক:সুরাইয়া আক্তার (সুমি)</span></p>
কপিরাইট - ক্রাইমলেটার.কম